২৭-ঈমান বিনষ্টকারী বিষয় সমূহ

ঈমান বিনষ্টকারী বিষয় সমূহ:

১) ইসলাম ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা:

ইসলামকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা ধর্মদ্রোহিতা মুলক কাজ। আল্লাহ্‌ বলেন:

(قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ)

“বলুন, তোমরা কি আল্লাহ্‌, তাঁর আয়াত সমূহ এবং রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছিলে? কোন ওযর পেশ কর না, ঈমান গ্রহণ করার পর অবশ্যই তোমরা কাফের হয়ে গেছ।” (সূরা তওবা-৬৫)

বর্তমান কালে কিছু লোক বলে থাকে- ইসলাম পুরাতন ধর্ম এ যুগে তা অচল, অথবা ইসলাম সেকেলে অনগ্রসর ধর্ম, অথবা বলে থাকে আধুনিক আইন-কানুন ইসলামের আইন-কানুন থেকে উত্তম, অথবা বলে থাকে যারা তাওহীদ.. তাওহীদ.. করে, মাজার-দরবার প্রভৃতির বিরোধিতা করে তারা কট্টরপন্থী.. ওয়াহাবী.. মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টিকারী..ইত্যাদি। অনেকে দাড়ি নিয়ে পর্দা নিয়ে হাঁসি-ঠাট্টা করে..। এগুলো সবই ঈমান বিধ্বংসী বিষয়।

২) আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত বিধানের বিপরীত শাসনকার্য পরিচালনা করা:

আল্লাহ্‌র উপর ঈমানের দাবী হল, তাঁর শরীয়ত অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করা। সকল শাসক ও বিচারকের উপর আবশ্যক হল কথা-কাজ, ঝগড়া-বিবাদ.. তথা সব ধরণের অধিকার সম্বলিত বিরোধের বিচার-ফায়সালা আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী করা। আর প্রজাদের উপরও আবশ্যক হল তারা আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার কামনা করা। কেননা ঈমান এবং গাইরুল্লাহ্‌র কাছে বিধান নেয়া এক ব্যক্তির মাঝে একত্রিত হতে পারে না। যেমন আল্লাহ্‌ বলেন:

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

“তোমার রবের কসম তারা ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত তারা পারস্পরিক মতবিরোধ পূর্ণ বিষয়ে তোমাকে ফায়সালাকারী না মানবে। অতঃপর তুমি যা ফায়সালা কর সে ব্যাপারে অন্তরে কোনরূপ সংকীর্ণতা রাখবে না এবং তার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পন করবে।” (সূরা নিসা- ৬৫) তিনি আরো বলেন:

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ

“আর আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা ফায়সালা করবে না, তারাই কাফের।” (সূরা ময়েদাহ্-৪৪) সুতরাং প্রত্যেকটি বিষয়ে- বেচা-কেনা, চুরির বিচার, ব্যাভিচারের শাস্তি.. ইত্যাদি আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী ফায়সালা করা আবশ্যক। শুধু বিবাহ তালাক ও ব্যক্তিগত বিষয়ে আল্লাহ্‌ বিধান মেনে চললে হবে না.. প্রতিটি বিষয় আল্লাহ্‌র বিধানের কাছে সোপর্দ করতে হবে। যে ব্যক্তি মানুষের জন্য বিধান রচনা করে বলবে এখন আর আল্লাহ্‌র বিধানের দরকার নেই, অথবা বলবে এ বিধান আল্লাহ্‌র বিধানের বরাবর, অথবা বলবে এ বিধানই বর্তমান যুগের জন্য অধিক প্রযোজ্য.. তবে সে কাফের। আল্লাহ্‌ বলেন,

أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنْ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ

“তাদের কি কোন শরীক দেবতা রয়েছে যারা তাদের জন্য শরীয়ত প্রণয়ন করেছে- যে ব্যাপারে আল্লাহ্‌ কোন অনুমতি দেননি?” (সূরা শূরা- ২১) আল্লাহ্‌ আরো বলেন,

أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنْ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ

“ওরা কি জাহেলী যুগের বিধান চায়? বিশ্বাসী জাতির জন্য আল্লাহ্‌র চাইতে কে অধিক উত্তম বিধান দিতে পারে?” (সূরা মায়েদাহ্- ৫০) ছহীহ্‌ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে: আল্লাহ্‌ যখন নাযিল করেন:

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

“তারা তাদের আলেম ও পাদ্রীদেরকে আল্লাহ্‌ ব্যতীত রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।” (সূরা তাওবাহ্-৩১) তখন আদী বিন হাতেম বলেন, (তিনি তখনও মুসলমান হননি), হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমরা তো তাদের ইবাদত করি না? তিনি বললেন, আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা কি তারা তোমাদের জন্য হারাম করে না? তখন তোমরা উহা হারাম হিসেবে গণ্য কর? আর আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা কি তারা তোমাদের জন্য হালাল করে দেয় না? আর তখন তোমরা উহা হারাম গণ্য কর? সে বলল, হ্যাঁ তা করে থাকি। তিনি বললেন, এটাই তো তাদের ইবাদত হল।” (তিরমিযী)

৩) কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব বা মুমীনদের সাথে শত্রুতা:

একথায় কোন সন্দেহ নেই যে, প্রতিটি মুসলিমের উপর ওয়াজিব হল- ইহুদী, খৃষ্টান, হিন্দু তথা সমস্ত কাফেরের সাথে শত্রুতা রাখা এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা থেকে সতর্ক থাকা। যেমনটি আল্লাহ্‌ এরশাদ করেন:

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنْ الْحَقِّ

“হে ঈমানদারগণ! আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না; তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছো, অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তা প্রত্যাখ্যান করেছে?” (সূরা মুমতহিনাহ্- ১)  বরং আল্লাহ্‌ তা’আলা পিতা, ভাই বা আত্মীয় স্বজনের কেউ যদি কাফের থাকে, তাদেরকেও ভালবাসতে নিষেধ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন,

لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ

“তুমি পাবে না আল্লাহ্‌ ও আখেরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সমপ্রদায়, যারা ভালবাসে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে, হোক না তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জ্ঞাতি-গোত্র।” (সূরা মুজাদালা- ২২) এ অর্থের আরো অনেক আয়াত রয়েছে। সবগুলো থেকে প্রমাণ হয়, কাফেরদেরকে ঘৃণা করা এবং তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা ওয়াজিব। কেননা তারা আল্লাহ্‌কে অবিশ্বাস করে, তাঁর দ্বীনের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। এদ্বীনের অনুসারীদের সাথে বৈরীতা রাখে; সর্বোপরি ইসলাম এবং মুসলমনাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। যেমনটি আল্লাহ্‌ বলেন,

 قَدْ بَدَتْ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمْ الْآيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُون، هَاأَنْتُمْ أُوْلَاءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمْ الْأَنَامِلَ مِنْ الغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ،إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ

“তাদের মুখ হতে শত্রুতা প্রকাশ হয়, আর তাদের অন্তর যা গোপন করে তা আরো গুরুতর; নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য নির্দেশাবলী ব্যক্ত করেছি, যেন তোমরা বুঝতে পার। সাবধান হও! তোমরাই তাদেরকে ভালবাস, অথচ তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না এবং তোমরা সমস্ত গ্রন্থই বিশ্বাস কর। তারা যখন তোমাদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং যখন তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে অঙ্গুলিসমূহ দংশন করতে থাকে। তুমি বল, তোমরা নিজেদের আক্রোশে মরে যাও! নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অন্তরের কথা পরিজ্ঞাত আছেন। যদি তোমাদেরকে কল্যাণ স্পর্শ করে তবে তারা অসন্তুষ্ট হয়; আর যদি তোমাদের অমঙ্গল উপস্থিত হয়, তারা আনন্দিত হয়ে থাকে। যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর ও আল্লাহ্‌কে ভয় কর, তবে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না; তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তা পরিবেষ্টনকারী।” (সূরা আল্ ইমরান- ১১৮- ১২০)

বর্তমান যুগেও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদী-খৃষ্টান চক্রের তৎপরতা কারো কাছে গোপন নয়। কিভাবে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। ইসলামের রাস্তাকে বন্ধ করার জন্য বিশাল আকারের অর্থ ব্যয় করছে। নানাভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধ কুৎসা রটনা ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানকালে কাফেরদের সাথে কতিপয় মুসলমানের বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত হচ্ছে: দা’ওয়াতী উদ্দেশ্য ছাড়া কাফেরদের সাথে মেলামেশা, তাদের দেশে বসবাস করা, বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই তাদের দেশে ভ্রমণে যাওয়া, জীবনের বিভিন্ন দিকে তাদের সাদৃশ্যাবলম্বন করা। যেমন, তাদের ষ্টাইলে পোষাক-পরিচ্ছেদ পরিধাণ করা.. ইত্যাদি।

৪) ছাহাবায়ে কেরামের দোষ-ত্রুটি অম্বেষণ করা:

আল্লাহ্‌র নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোন ছাহাবীকে খাট দৃষ্টিতে দেখা বা তাদেরকে গালি-গালাজ করা বা নবী পরিবারের কোন ব্যক্তির ছিদ্রাম্বেষণ করা- ঈমান বিধ্বংশকারী বিষয়।

আমরা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর ছাহাবীদেরকে ভালবাসি। তাদেরকে ভালবাসতে গিয়ে কোন প্রকার বাড়বাড়ি করি না- না আলী (রা:)কে নিয়ে না অন্য কাউকে নিয়ে। তাদের কারো থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করি না। ছাহাবীদেরকে যারা ঘৃণা করে তাদেরকে আমরা ঘৃণা করি। ছাহাবীদের বিষয়ে ভাল ছাড়া অন্য কথা বলি না। আল্লাহ্‌ বলেন,

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ

“মুহাজির এবং আনছারদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীগণ এবং সঠিকভাবে যারা তাদের অনুসরণ করবে, আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহ্‌র উপর সন্তুষ্ট।” (সূরা তাওবাহ্-১০০)

তবে ছাহাবীদের মধ্যে যে সমস্ত মতবিরোধ বা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি হল- এগুলোর বিশ্লেষণ থেকে বিরত থাকা। তাঁরা মানুষ ছিলেন এবং মুজতাহিদ (গবেষক) ছিলেন। তাঁরা ভুলও করেছেন সঠিকও করেছেন। ঐ সময় সংঘটিত ফিৎনা থেকে আল্লাহ্‌ যেমন আমাদের তরবারীকে বাঁচিয়েছেন, তেমনি আমরাও তাদের সমালোচনা থেকে আমাদের যবানকে হেফাযত করব। আমরা বলি, তাদের পালনকর্তা তাদেরকে ক্বিয়ামত দিবসে অবশ্যই একত্রিত করবেন এবং তাদের মাঝে হক্ব ফায়সালা ও বিচারের ন্যায়দন্ড প্রতিষ্ঠা করবেন।

আমরা বিশ্বাস করি রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর পর তাঁর প্রথম খলীফা বা প্রতিনিধি হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রা:)।
কেননা তিনি ছিলেন উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি। তারপর খলীফা হচ্ছেন হযরত ওমার বিন খাত্তাব (রা:), তারপর উছমান বিন আফ্‌ফান (রা:) এবং তাঁর পরে আলী বিন আবী তালিব (রা:)।

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s