২৬-ঈমানের রুকন সমূহ

ঈমানের রুকন সমূহ

১) আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

এ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা সকল বস্তুর রব বা পালনকর্তা। তিনিই সব ধরণের ইবাদত পাওয়ার অধিকারী। তাঁর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী রয়েছে।

(لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ)

“তাঁর অনুরূপ কোন কিছু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা শূরা- ১১)

আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ্‌ তা’আলা যখন ইচ্ছা যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা কথা বলেন। তিনি এরশাদ করেন:

(وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا)

“আল্লাহ্‌ তা’আলা মূসার সাথে কথা বলেছেন।” (সূরা নিসা- ১৬৪) কুরআনসহ সমস্ত আসমানী কিতাব আল্লাহ্‌র বাণী।

আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বসত্বায় ও গুণাবলীতে সমস্ত সৃষ্টির উর্ধে। তিনি ছয় দিনে আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন। তারপর আর্‌শে আযীমে উন্নীত হয়েছেন। আর্‌শে তাঁর অবস্থান কিভাবে তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না। তিনি সপ্তাকাশের উপর আর্‌শে আযীমে অবস্থান করা সত্বেও সৃষ্টিকুলের যাবতীয় অবস্থা অবগত। তাদের সব কথা শুনেন, তাদের কর্ম অবলোকন করেন, যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, মু‘মিনগণ ক্বিয়ামত দিবসে জান্নাতের মধ্যে আল্লাহ্‌ তা’আলাকে দেখবে। আল্লাহ্‌ বলেন,

(وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ)

“সে দিন কতিপয় মুখমন্ডল উজ্জল হবে, তারা তাদের পালনকর্তার দিকে দৃষ্টিপাত করবে।” (সূরা- ক্বিয়ামাহ্- ২২, ২৩)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা স্বীয় কিতাবে নিজের গুণাবলীর ব্যাপারে এবং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্‌র গুণাবলীর ব্যাপারে হাদীছের মধ্যে যে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি আমরা বিশ্বাস রাখি। এ সমস্ত গুণাবলীর প্রকৃত অর্থের প্রতি- আল্লাহ্‌র শানে যেভাবে প্রযোজ্য হয়- আমরা সেভাবেই বিশ্বাস পোষণ করি। কোন প্রকার ব্যাখ্যা বা বিকৃতির প্রশ্রয় নেই না।

২) ফেরেস্তাদের প্রতি ঈমান:

আল্লাহ্‌ তাঁদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কর্ম বন্টন করে দিয়েছেন। নিষ্ঠার সাথে তাঁরা তা পালন করে থাকেন। তাঁরা আল্লাহ্‌র বান্দা। কখনই তাঁর নির্দেশের অবাধ্যতা করেন না। ফেরেস্তাদের সংখ্যা অগণীত। তাঁরা সর্বাধিক আল্লাহকে ভয় করেন এবং সবচাইতে বেশী তাঁর ইবাদত করেন।

ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীছ বর্ণনা করেছেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আসমানে ‘বায়তুল মা‘মূর’ নামে একটি ঘর আছে। তার মধ্যে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেস্তা ছালাত আদায় করেন। তারা ছালাত শেষে বের হওয়ার পর ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পান না।”

আবূ দাঊদ ও ত্ববরাণীতে ছহীহ্‌ সনদে বর্ণিত হয়েছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,(أُذِنَ لِي أَنْ أُحَدِّثَ عَنْ مَلَكٍ مِنْ مَلَائِكَةِ اللَّهِ مِنْ حَمَلَةِ الْعَرْشِ إِنَّ مَا بَيْنَ شَحْمَةِ أُذُنِهِ إِلَى عَاتِقِهِ مَسِيرَةُ سَبْعِ مِائَةِ عَامٍ)   “আল্লাহ্‌র ফেরেশ্‌তাদের মধ্যে থেকে আরশ বহণকারী একজন ফেরেস্তার বিবরণ দেয়ার অনুমতি আমাকে দেয়া হয়েছে। তার কানের নিম্নাংশ থেকে কাঁধ পর্যন্ত সাত’শ বছরের রাস্তা বরাবর দূরত্ব। (আবূ দাঊদ)

বিভিন্ন ফেরেস্তার জন্য বিভিন্ন ধরণের কর্ম বন্টন করা আছে:

যেমন জিবরীল (আ:) নবী-রাসূলদের কাছে ওহী নিয়ে আসার দায়িত্বে নিয়োজিত। মিকাঈল (আ:) বৃষ্টি এবং উদ্ভিদের দায়িত্বে নিয়োজিত। ইসরাফীল (আ:) ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় শিংগায় ফুৎকারের দায়িত্বে নিয়োজিত। মালাকুল মওত ফেরেস্তা প্রাণীকুলের জান কবজের দায়িত্বে নিয়োজিত। মালেক ফেরেস্তা জাহান্নামের দারোগা হিসেবে নিয়োজিত।

কোন কোন ফেরেস্তা মাতৃগর্ভে ভ্রুণের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। অন্যরা আদম সন্তানের হেফাযতের কাজে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে মানুষের আমল লিখনের দায়িত্ব অর্পিত আছে কোন কোন ফেরেস্তার উপর। কবরে মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার জন্যও দু’জন ফেরেস্তা নিয়োগ করা আছে…।

এই হল ফেরেস্তাদের পরিচয়। ফেরস্তাদের জগত অদৃশ্য। আমরা যদিও তাদেরকে না দেখি তবুও তাদের অস্তিত্বের প্রতি ঈমান রেখে থাকি।

এছাড়া আরো অদৃশ্য সৃষ্টি রয়েছে। তারা হল জ্বিন জাতি। এরা আগুনের তৈরী। মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহ্‌ তাদেরকে সৃষ্টি করেন। আল্লাহ্‌ বলেন,

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَارِ السَّمُومِ

“নিশ্চয় আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি ছাঁচে ঢালা শুস্ক ঠন্‌ঠনে মাটি হতে। এর পূর্বে জ্বিনকে সৃষ্টি করেছি প্রখর শিখাযুক্ত অগ্নি হতে।” (সূরা হিজর- ২৬)

এরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করার ব্যাপারে নির্দেশিত। তাদের মধ্যে কেউ মু’মিন কেউ কাফের। কেউ আনুগত্যকারী কেউ গুণাহ্‌গার। এরা কখনো মানুষের উপর অত্যাচার করে থাকে। আবার মানুষও কখনো জ্বিনদের উপর অন্যায় করে থাকে। যেমন: হাড্ডি বা গোবর দিয়ে ইস্‌তেঞ্জা করার মাধ্যমে মানুষ তাদের উপর যুলুম করে থাকে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাড্ডি ও গোবর সম্পর্কে বলেন, “তোমরা এ দু’টি বস্তু দিয়ে শৌচকার্য কর না।” কেননা হাড্ডি জ্বিন জাতির খাদ্য আর গোবর জ্বিনদের প্রাণীকুলের খাদ্য। (মুসলিম)

মানুষের উপর জ্বিনদের শত্রুতা: যেমন- মানুষকে কুমন্ত্রনা দেয়া, তাদেরকে ভয় দেখানো, রোগাক্রান্ত করা.. ইত্যাদি।

তবে হাদীছ থেকে প্রমাণিত দুআ বা যিকির-আযকারের মাধ্যমে মু’মিন ব্যক্তি জ্বিনের অনিষ্ট থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। যেমন- আয়াতুল কুরসী পাঠ করা, মুআব্‌বেযাত (সূরা ইখলাছ, ফালাক্ব ও নাস) পাঠ করা। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত অন্যান্য দুআ-যিকির সমূহ পাঠ করা। এগুলো ছেড়ে দিয়ে জ্বিনদের উদ্দেশ্যে পশু বলি দেয়া, তাদেরকে ডাকা প্রভৃতি শির্কের পর্যায়ভূক্ত।

সন্দেহ নেই জ্বিন-শয়তান দুর্বল। তাদের ষড়যন্ত্র দুর্বল। কিন্তু মানুষের মাঝে যখন পাপের হার বৃদ্ধি পায়.. টিভি, ডিশ, ভিডিও প্রভৃতির মাধ্যমে হারাম দৃশ্য অবলোকন করে.. গান-বাদ্যে লিপ্ত হয়.. তখন ঈমান দুর্বল হয়ে যায়, আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরে, তাঁর স্মরণ থেকে উদাসীন হয়, দুআ ও যিকির-আযকারের মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করে না… আর তখন শয়তান তার উপর বিজয়ী হয় এবং সহজেই তাকে বিভ্রান্ত করে, বিপদগ্রস্থ করে। আল্লাহ্‌ তা’আলা শয়তান এবং তার বাহিনী সম্পর্কে বলেন,

إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ

“তার (শয়তানের) আধিপত্য চলে না তাদের উপর, যারা সঠিকভাবে ঈমান রাখে এবং স্বীয় পালনকর্তার উপর ভরসা করে। তার আধিপত্য তো তাদের উপরই চলে, যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং যারা তাকে অংশীদার মানে।” (সূরা নাহাল- ৯৯-১০০)

৩) আসমানী কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান:

আসমানী কিতাব বলতে সেই সমস্ত পুস্তক বুঝায়- আল্লাহ্‌ তা’আলা যা সৃষ্টিকুলের হেদায়াতের জন্য তাঁর নবীদের প্রতি অবতরণ করেছেন। এগুলোর সংখ্যা অনেক। আমরা সবগুলোর প্রতি ঈমান রাখি। এর মধ্যে মাত্র চারটি সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। কুরআন নাযিল হয়েছে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর। তাওরাত মূসা (আ:)এর উপর। ইঞ্জিল ঈসা (আ:)এর উপর। এবং যাবুর দাঊদ (আ:)এর উপর। এগুলো সবই আল্লাহ্‌র বাণী। কুরআন হচ্ছে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। পূর্ববর্তী সমস্ত গ্রন্থের সারসংক্ষেপ এর মধ্যে বিদ্যমান। আল্লাহ্‌ বলেন,

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنْ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ

“আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।” (সূরা মায়েদা- ৪৮)

৪) নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান:

আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মিশন ছিল- মানুষকে একথার প্রতি আহ্বান করা: তোমরা এককভাবে আল্লাহ্‌র ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক কর না। সর্বপ্রথম রাসূল হচ্ছেন নূহ (আ:) ও সর্বশেষ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।

নবী-রাসূলদের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কুরআনে কতিপয় নবীর নাম ও তাঁদের ঘটনাবলী উল্লেখ করেছেন। আর অধিকাংশেরই নাম উল্লেখ করেন নি। আমরা সবার প্রতিই ঈমান রাখি। আল্লাহ্‌ বলেন,

(وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ مِنْهُمْ مَنْ قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَنْ لَمْ نَقْصُصْ عَلَيْكَ)

“আপনার পূর্বে আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি। তাদের কারো কারো ঘটনা আপনার কাছে বিবৃত করেছি এবং কারো কারো ঘটনা আপনার কাছে বিবৃত করিনি।” (সূরা আল মু’মিন- ৭৮) তাঁরা আল্লাহ্‌র সৃষ্টি মানুষ্য জাতির অন্তর্গত। তাঁদের মাঝে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এতটুকুই পার্থক্য যে, তাঁদের কাছে ওহী করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেন,

(قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ)

“বলুন আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ তবে আমার কাছে ওহী করা হয়।” (সূরা কাহাফ- ১১০) হ্যাঁ তাঁরা মানুষ। তাঁরা পানাহার করেন। অসুস্থ হন মৃত্যু বরণ করেন। তাঁদের ব্যাপারে এসব কিছুর প্রতি ঈমান রাখতে হবে।

তাঁদের মধ্যে থেকে কোন একজনকে যদি কেউ অস্বীকার করে তবে সে কাফের; বরং সমস্ত রাসূলকে অস্বীকারকারী হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা নূহ (আ:)এর কওম সম্পর্কে বলেন, كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ “নূহের জাতি রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।” (সূরা শুআ’রা- ১০৫) হূদ (আ:)এর জাতি সম্পর্কে বলেন, كَذَّبَتْ عَادٌ الْمُرْسَلِينَ “আ’দ জাতি রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।” (সূরা শুআ’রা- ১২৩) অথচ এ সমস্ত লোক শুধু তাদের নবীদেরকেই অস্বীকার করেছিল। কিন্তু যেহেতু সমস্ত নবীদের মিশন একই ছিল; তাই তাঁদের একজনকে যে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে, সে সমস্ত নবীকেই মিথ্যা প্রতিপন্নকারী বলে গণ্য হবে।

এভিত্তিতে খৃষ্টানদের মধ্যে যারা নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাঁর অনুসরণ করে নি; তারা প্রকৃতান্তরে ঈসা বিন মারইয়ামকেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং তারা কাফের। কেননা তিনি তাদেরকে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর আগমণ সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আদেশ দিয়েছিলেন তাঁর অনুসরণ করার। কিন্তু তারা তা করে নি। এরূপই কথা হল ইহুদী ও অন্যদের সম্পর্কে।

৫) শেষ দিবসের প্রতি ঈমান:

মৃত্যুর পর যা ঘটবে সে সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা’আলা কুরআনে যা উল্লেখ করেছেন বা তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীছে যা বলেছেন তার সবকিছু বিশ্বাস করা। প্রথমে আমরা বিশ্বাস করব কবরের শাস্তি ও শান্তি সম্পর্কে। কবরের শাস্তি বা শান্তি কুরআন ও সুন্নাহ্‌র দলীল দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ্‌ বলেন,

وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ

“আর ফেরাউন গোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করল, সকালে ও সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।” (সূরা মু‘মিন- ৪৫- ৪৬)

আল্লাহ্‌ মুনাফেকদের সম্পর্কে বলেন:

(سَنُعَذِّبُهُمْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ)

“তাদেরকে দু’বার শাস্তি দিব, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে ভীষণ আযাবের দিকে।” (সূরা তাওবা- ১০১) আবদুল্লাহ্‌ বিন মাসঊদ (রা:) এবং অন্যরা বলেন, প্রথম আযাব হল দুনিয়াতে, দ্বিতীয়টি হল কবরের আযাব, এরপর ক্বিয়ামত দিবসে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের ভীষণ শাস্তির দিকে।

কবরের শাস্তি ও শান্তি সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ইবনুল ক্বাইয়েম (র:) বলেন এ সম্পর্কে হাদীছ সমূহ মুতাওয়াতের পর্যায়ের। (তথা সন্দেহাতীত সনদে প্রমাণিত।) এ সম্পর্কে পঞ্চাশোর্ধ হাদীছ রয়েছে। তম্মধ্যে একটি:

أن النبي صلى الله عليه وسلم  مَرَّ بِقَبْرَيْنِ فَقاَلَ: “إنَّهُماَ ليُعَذَّباَنِ وَماَ يُعَذَّباَنِ فِيْ كَبِيْرٍ أماَّ أحَدُهُماَ فَكاَنَ لاَ يَسْتَـتِـرُ مِنَ الْبَوْلِ وَأماَّ الآخَرُ فَكاَنَ يَمْشِيْ بِالنَّمِيْمَةِ

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা দু’টি কবরের নিকট দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “কবর দু’টির অধিবাসীদেরকে আযাব দেয়া হচ্ছে। আযাবের কারণ খুব বড় নয়। হ্যাঁ উহা বড় পাপই তো। তাদের একজন চুগলখোর (যে ব্যক্তি একজনের কথা অন্যকে বলে বেড়ায়- উভয়ের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে) ছিল। আর অপরজন নিজেকে পেশাব থেকে পবিত্র রাখত না।” (বুখারী ও মুসলিম)

আর একটি হাদীছ: রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুআ করতেন: (اللهُمَّ إنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عّذاَبِ الْقَبْرِ ) “হে আল্লাহ্‌ নিশ্চয় আমি তোমার কাছে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (বুখারী ও মুসলিম)

কবরের শাস্তি বা শান্তি বিষয়টি গায়েবী তথা অদৃশ্যের বিষয়। বিবেক দিয়ে তা বিচার করা সম্ভব নয়।

শেষ দিবসের প্রতি ঈমানের অন্তর্গত হল:

পূনরুত্থান তথা শিংগায় ফুৎকারের সময় মৃতদের পূণরায় জীবিত হওয়ার প্রতি বিশ্বাস রাখা। সে সময় সকলেই উলঙ্গ, নগ্নপদ ও খাতনা বিহীন অবস্থায় উত্থিত হবে। আল্লাহ্‌ বলেন,

ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَمَيِّتُونَ ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ

“এরপর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অত:পর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে।” (সূরা মু’মিনূন- ১৫-১৬)

হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিদানের প্রতি ঈমান রাখা। আল্লাহ্‌ বলেন,

إِنَّ إِلَيْنَا إِيَابَهُم ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا حِسَابَهُمْ

“নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। তারপর আমার উপরই তাদের হিসাব-নিকাশ (গ্রহণের ভার)।” (সূরা গাশিয়া ২৫-২৬)

জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান রাখা। জান্নাত আল্লাহ্‌ ভীরুদের আবাসস্থল। এর মধ্যে এমন বস্তু রয়েছে যা কোন চক্ষু অবলোকন করেনি, সে সম্পর্কে কোন কান শোনে নি, আর না কোন মানুষের হৃদয় তা কল্পনা করতে পারে। জাহান্নাম শাস্তির স্থান। কাফের মুনাফেকদের জন্য সেখানে যে শাস্তি রয়েছে যা কল্পনাতীত।

এমনিভাবে ক্বিয়ামতের পূর্বে ছোট-বড় সবধরণের আলামত সম্পর্কে ঈমান রাখতে হবে। যেমন- দাজ্জাল বের হওয়া। আসমান থেকে ঈসা (আ:)এর অবতরণ। পশ্চিম দিক থেকে সূর্যদয়। মাটির ভিতর থেকে একটি প্রাণী বের হওয়া… ইত্যাদি।

শাফাআ’ত, হাউযে কাঊছার, দাঁড়ি-পাল্লা, জান্নাতের মধ্যে আল্লাহ্‌র দর্শন… ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কেও ঈমান রাখতে হবে।

৬) তক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান:

ঈমান রাখতে হবে যে, আল্লাহ্‌ তা’আলার জ্ঞান অপরিসীম হওয়ার কারণে প্রতিটি বিষয় সংঘটিত হওয়ার আগেই তিনি সে সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। প্রতিটি বিষয় ব্যাপকভাবে এবং বিশদভাবে তিনি জ্ঞান রাখেন। আর তা লওহে মাহফূযে (সংরক্ষিত কিতাবে) লিখে রেখেছেন। তিনি সমস্ত জগতকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন,

اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ

“আল্লাহ্‌ সমস্ত বস্তু সৃষ্টিকারী এবং তিনি সবকিছুর উপর তত্বাবধায়ক।” (সূরা যুমার- ৬২) এ জগতে যা কিছুই ঘটুক আল্লাহ্‌ সে সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। তিনি এরশাদ করেন,

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ

“নিশ্চয় আমি প্রতিটি বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা ক্বামার- ৪৯)

প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা ও সামর্থ রয়েছে। সে অনুযায়ী কোন কর্ম বাস্তবায়ন বা পরিত্যাগের সে স্বাধীনতা রাখে। চাইলে সে ওযু করতে বা ছালাত আদায় করতে পারে, ইচ্ছা করলে বিভ্রান্ত হতে পারে বা অশ্লীল কর্মে জড়িতও হতে পারে.. সবক্ষেত্রেই সে স্বাধীন। একারণেই তার হিসাব নেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকে প্রতিদানও দেয়া হবে। সুতরাং কোন ওয়াজিব বিষয় পরিত্যাগ করে বা অন্যায় কর্মে লিপ্ত হয়ে তক্বদীরের দোষ দেয়া বৈধ হবে না।

****

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s