১৮-চারটি প্রশ্ন

চারটি প্রশ্ন..

প্রথম: কবর পূজারীদের কেউ কেউ বলতে পারে। তোমরা আমাদের উপর বেশী বাড়াবাড়ি করছ। আমরা তো কোন মৃতের ইবাদত করি না। এ সমস্ত ওলী-আউলিয়া নেক লোক। আল্লাহ্‌র কাছে তাদের সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তারা আমাদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে সুপারিশ করতে পারেন।

জবাবে আমরা বলব: এটাই ছিল কুরাইশ কাফেরদের কথা তাদের মূর্তী সম্পর্কে। আরবের মুশরিকগণ তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ্‌কে  স্বীকার করত। তাদের বিশ্বাস ছিল স্রষ্টা, রিযিকদাতা নিয়ন্ত্রনকর্তা.. একমাত্র আল্লাহ্‌ তা‘আলা। এসব ক্ষেত্রে তাঁর কোন শরীক নেই। যেমন তাদের কথা আল্লাহ্‌ কুরআনে উল্লেখ করেছেন:

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنْ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنْ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنْ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ

“আপনি বলুন! কে আসমান ও যমীন থেকে তোমদেরকে রিযিক দান করে? কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভিতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্যে থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ্‌! তখন তুমি বলো, তারপরেও ভয় করছ না?” (সূরা ইউনূস- ৩১) এরপরও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাদের রক্তপাত ও সম্পদ বৈধ করেছেন। কেননা তারা সব ধরণের ইবাদত এককভাবে আল্লাহ্‌র জন্য নির্দিষ্ট করেনি।

কুরআনের আয়াতে ও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর হাদীছে গাইরুল্লাহ্‌র ইবাদতের ব্যাপারে যে সব নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা থেকে বুঝা যায়- শির্ক হল, ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র জন্য কোন শরীক নির্ধারণ করার নাম। চাই উক্ত শরীক মূর্তী হোক বা পাথর বা নবী বা ওলী বা কবর বা মাজার। শির্ক হচ্ছে আল্লাহ্‌র জন্য যা নির্দিষ্ট তা থেকে কিছু অংশ গাইরুল্লাহ্‌র জন্য করা। চাই উক্ত বস্তুর নাম জাহেলী যুগের নামের মত হোক যেমন মূর্তী বা প্রতিমা বা অন্য কোন নাম হোক যেমন ওলী বা কবর বা মাজার।

বর্তমান যুগে যদি কোন দল প্রকাশ হয়ে দাবী করে ও ঘোষণা করে যে, আল্লাহ্‌র স্ত্রী সন্তান আছে তবে তাদের বিধান খৃষ্টানদের বিধানের মত হবে। আর খৃষ্টানদের ব্যাপারে যে সমস্ত আয়াত নাযিল হয়েছে সবগুলোই তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে- যদিও তারা নিজেদেরকে খৃষ্টান হিসেবে গণ্য না করে। কেননা তাদের উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এরূপই হল বর্তমান যুগে কবর পূজার ব্যাপারটি।

দ্বিতীয়: কবরের সাথে সম্পর্কিত কোন ব্যক্তি প্রশ্ন করতে পারে, আমরা কবরস্থিত ওলী-আউলিয়াদের নিকটে শুধু মাত্র শাফাআত লাভের আশায় গিয়ে থাকি। এ সমস্ত ব্যক্তি দুনিয়ায় অতি নেকবখত ছিলেন। দিনে ছিয়াম পালন করতেন, রাতে ক্রন্দন করে ছালাত আদায় করতেন.. নি:সন্দেহে আল্লাহ্‌র কাছে তাদের আলাদা মান-মর্যাদা রয়েছে। আমরা শুধু এ আশা করি যে, তাঁরা আমাদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে সুপারিশ করবেন।

আমরা তাদেরকে বলব: ওহে ভাই! আল্লাহ্‌ তোমাদের হেদায়াত করুন! তোমরা আল্লাহ্‌র দাঈর ডাকে সাড়া দাও, আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আন। আল্লাহ্‌ তা’আলা কাউকে সুপারিশকারী গ্রহণ করাকেই শির্ক বলেছেন। তিনি এরশাদ করেন:

وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ

“আর আল্লাহ্‌কে বাদ দিয়ে তারা এমন বস্তুর উপাসনা করে যা তাদের কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না এবং বলে এরা আমাদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে সুপারিশকারী। তুমি বল, তোমরা কি আল্লাহ্‌কে এমন বিষয়ে অবহিত করছ, যে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন আসমান ও যমীনের মাঝে? তিনি পূত:পবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরীক করছো।” (সূরা ইউনূস- ১৮)

আমরা তোমাদের মতই বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্‌ নবী ওলীদেরকে সুপারিশের অধিকার দিয়েছেন। কেননা তাঁরাই আল্লাহ্‌র সর্বাধিক নিকটবর্তী বান্দাহ্‌। কিন্তু আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিষেধ করেছেন তাদের কাছে কোন কিছু চাইতে বা তাদেরকে দু‘আ করতে। হ্যাঁ, আল্লাহ্‌ তা‘আলা নবী, ওলী, শহীদ.. প্রভৃতিদেরকে সুপারিশ করার অধিকারী করেছেন। কিন্তু তাদের অধিকারে এ ক্ষমতা নেই যে, যাকে ইচ্ছা তারা সুপারিশ করবেন.. যাকে ইচ্ছা সুপারিশ করবেন না। কখনই নয়, বরং আল্লাহ্‌র অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত এবং যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার উপর আল্লাহ্‌ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সুপারিশই করবেন না। আর এ সুপারিশ শুধু হবে ক্বিয়ামত ময়দানে।

তৃতীয়: মাজার পূজারীদের কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে- অধিকাংশ মুসলমান পূর্ব যুগে বা বর্তমান যুগে তো কবরের উপর ঘর তৈরী করে.. দরগাহ বানায়.. গম্বুজ নির্মাণ করে.. সে সমস্ত স্থানে দু‘আ করতে সচেষ্ট হয়। তাহলে কি এত সব মানুষ বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত? আর তোমরাই শুধু হকের উপর প্রতিষ্ঠিত?

জবাবে আমরা বলব, এ সমস্ত দরগাহ্‌ ও মাজারের অধিকাংশই মিথ্যা। তাদের নামে এ সমস্ত মাজারকে সম্বন্ধ করা সঠিক নয়, যেমনটি ইতপূর্বে আপনি দেখেছেন। তাছাড়া কবরের উপর ঘর তৈরী.. সেখানে বেশী করে দু‘আ করতে সচেষ্ট হওয়া.. প্রভৃতি জঘণ্য ধরণের বিদআত। যেমনটি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আল্লাহ্‌ তা‘আলা ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রতি লা‘নত (অভিশাপ) করেছেন। কেননা তারা তাদের নবীদের কবরকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরী করেছে। একথা বলে তিনি তাদের কৃতকর্ম থেকে মানুষকে সতর্ক করতে চেয়েছেন।” (বুখারী ও মুসলিম)  তাছাড়া কবরকে পাকা করা, তার উপর ঘর উঠানো, তার নাম পরিচয় লিখা, তার উপর বসা, চলা, হেলান দেয়া.. সবই ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী হারাম কাজ। (দেখুন মুসলিম, আবূ দাঊদ প্রভৃতি)

চতুর্থ: কারো কারো অন্তরে শয়তান আর একটি সংশয় সৃষ্টি করতে পারে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কবর তো মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট- অথচ এতে কোন প্রতিবাদ নেই? যদি মসজিদে কবর থাকা হারাম হত তবে তাঁকে মসজিদের মধ্যে দাফন করা হত না। তাছাড়া নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কবর শরীফের উপর গম্বুজও আছে?

উত্তর: নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেখানে মৃত্যু বরণ করেছেন সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। কেননা হাদীছে এসেছে, “নবীগণ যেস্থানে মৃত্যু বরণ করেন সেখানেই তাঁদেরকে দাফন করা হয়।” তাই তাঁকে আয়েশা (রা:) এর গৃহে দাফন করা হয়েছে- তাঁকে মসজিদে দাফন করা হয়নি। এটা ছিল প্রথম অবস্থার কথা। ছাহাবায়ে কেরাম নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছ অনুযায়ী তাঁকে আয়েশার গৃহে দাফন করেন। যাতে করে তাঁদের পর কেউ তাঁর কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করতে না পারে। যেমনটি আয়েশা (রা:) বর্ণিত হাদীছে বলা হয়েছে। তিনি বলেন,

(عَنْ عَائِشَةَ رَضِي اللَّه عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهم عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي مَرَضِهِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسْجِدًا قَالَتْ وَلَوْلَا ذَلِكَ لَأَبْرَزُوا قَبْرَهُ غَيْرَ أَنِّي أَخْشَى أَنْ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا)

রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুমূর্ষু অবস্থায় বলেছিলেন, “আল্লাহ্‌ তা‘আলা ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রতি লা‘নত (অভিশাপ) করেছেন। কেননা তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।” হযরত আয়েশা বলেন, উক্ত নির্দেশ এবং এ হাদীছ যদি না থাকত, তবে তাঁর কবরকে বাইরে রাখা হত। কিন্তু তিনি ভয় করেছিলেন যে, তাঁর কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আয়েশার ঘর পূর্ব দিকে মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। বছর গড়াতে থাকলো, মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলো.. ছাহাবীগণও কবরের দিক বাকি রেখে অন্যান্য দিক প্রশস্থ করলেন। প্রশস্থ হল পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষীণ দিকে- পূর্ব দিকে নয়, কেননা সেদিকে কবর থাকার কারণে তা প্রশস্থ করা সম্ভব হয়নি। ৮৮ হিজরী তথা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওফাতের ৭৭ বছর পর- যখন মদীনায় বসবাসকারী অধিকাংশ ছাহাবায়ে কেরাম মৃত্যু বরণ করেছেন। উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ বিন আবদুল মালিক মসজিদে নববী সমপ্রসারণ করার জন্য তা ভেঙ্গে ফেলার আদেশ দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন মসজিদকে চতুর্দিক থেকে বৃদ্ধি করার। এমনকি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রীদের ঘরগুলোকেও সংশ্লিষ্ট করার আদেশ দিলেন। সে সময় পূর্ব দিকে মসজিদ বৃদ্ধি করা হল এবং আয়েশা (রা:) এর ঘর তথা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কবর শরীফকে মসজিদের মধ্যে করে দেয়া হল। (মাজমু ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়া ২৭/৩২৩, তারিখু ইবনু কাছীর ৯/৭৪)

এ হল কবর এবং মসজিদের ঘটনা..

সুতারাং ছাহাবায়ে কেরামের পর যা ঘটেছে তা দলীল হিসেবে গ্রহণ করা কারো জন্য কোন ক্রমেই বৈধ হবে না। কেননা তা সুস্পষ্ট ও ছহীহ্‌ হাদীছ সমূহ এবং সালাফে ছালেহীনের নীতি বিরোধী কথা। কোন সন্দেহ নেই যে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কবরকে মসজিদের মধ্যে শামিল করে খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক ভুল করেছেন। (আল্লাহ্‌ তাকে ক্ষমা করুন) কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের উপর ঘর তৈরী করতে নিষেধ করেছেন। উচিত ছিল অন্যান্য দিকে মসজিদকে বৃদ্ধি করা কবরের দিকে নয়- যেমন ছাহাবায়ে কেরামের যুগে হয়েছিল। এমনিভাবে কোন কবরের উপর গম্বুজও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে তৈরী হয়নি। ছাহাবায়ে কেরাম বা তাবেঈন বা তাবেতাবেঈনদেরও কারো যুগে হয় নি। এমনকি মুসলিম মিল্লাতের অনুসরণীয় ইমামদের কারো যুগেও তা ঘটেনি। বরং নবীজির কবরের উপর এ গম্বুজ তৈরী করেছে পরবর্তী যুগের জনৈক মিছরী বাদশাহ্‌ ৬৭৮ হিজরীতে। তার নাম ছিল ‘কলাউন ছালেহী’ কিন্তু সে পরিচিত ছিল ‘মানছূর’ নামে। (তাহযীর সাজেদ আলবানী ৯৩পৃ:, ছরাঊন বাইনাল হাক্বি ওয়াল বাতিল- সা’দ ছাদেক ১০৬ পৃ:, তাত্বহীরুল ই’তিক্বাদ ৪২পৃ:)

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s