১৭-শির্কের উত্তরাধিকারী

শির্কের উত্তরাধিকারী

এতক্ষণ আমরা নূহ ও ইবরাহীম (আ:) এর সমপ্রদায়ের লোকদের শির্কের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হলাম। এবার আমরা প্রশ্ন রাখি বর্তমান যুগের দরগাহ ও কবর পূজারী মুশরেকদের কাছে, কিভাবে তোমাদের মধ্যে শির্কের অনুপ্রবেশ হল? উত্তর কবর ও মাজারের মাধ্যমে। কবর ও মাজারের সাথে কিভাবে সম্পর্ক গড়ে উঠল- যার ফলাফল হল আল্লাহ্‌র সাথে শির্ক?

সম্পর্কের মাধ্যম হল, নেক ও পরহেযগার লোকদেরকে শ্রদ্ধা ও অতিভক্তি করার মধ্য দিয়ে। এথেকে তাদের দরবার, কবর ও মাজার যিয়ারতকে পূণ্যের কাজ মনে করা হল। তাদের কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্য নয় মৃত্যু বা আখেরাতকে স্মরণ করা; বরং উদ্দেশ্য হল, নেককার শাইখ বা পীর সাহেবকে স্মরণ করা, তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তারপর সেখানে দু‘আ করলে কবূল হবে এ আশায় দু‘আ শুরু হল। শুরু হল কবরকে স্পর্শ করা ও চুম্বন। তারপর তাকে মনে করা হল আল্লাহ্‌র দরবারে সুপারিশের উসীলা বা মাধ্যম।

তাদের ধারণা হল এ সমস্ত মাজারের অধিবাসীগণ পবিত্র ও সম্মানিত, নৈকট্যপ্রাপ্ত ও মহান, আল্লাহ্‌র কাছে তাদের বিশেষ স্থান রয়েছে… অন্যদিকে তারা হল গুণাহগার-পাপী ও মূর্খ, সরাসরি আল্লাহ্‌কে ডাকা তাদের জন্য সমিচীন নয়। সুতরাং কবরের অধিবাসী পীর-বুযুর্গই নিঃসন্দেহে হতে পারেন তার এবং আল্লাহ্‌র মাঝে মধ্যস্থতাকারী।

এরপর শয়তান সেই যিয়ারতকারীর অন্তরে কুমন্ত্রনা দেয়.. যখন কিনা ইনি পবিত্র ও সম্মানিত.., হতে পারে আল্লাহ্‌ তাকে কিছু না কিছু ক্ষমতা বা প্রভাব দিয়েছেন..।

তখন উদয় হয় তার হৃদয়ে মাজার সম্পর্কে মহত্ম ভয়-ভীতি ও আশা-আকংখা।

এর পরের অধ্যায় হল শির্কের বাস্তব প্রয়োগ। সেখানে তৈরী হয় মসজিদ.. দরগাহ.. মাজার.. গম্বুজ..।

জালানো হয় মোমবাতি-আগরবাতী। পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়.. লাল সবুজ কাপড় লটকিয়ে রাখা হয়.. কখনো মশারিও টানানো হয়। তারপর তার কাছে দু‘আ চায়, তার কাছে উদ্ধার কামনা করে। কখনো সিজদা করে.. তওয়াফ করে.. কবরকে চুম্বন ও স্পর্শ করে..।

উরূসের নামে সেখানে পশু যবেহ্‌ হয়। কারামতের নাম করে নানা ধরণের মিথ্যা কিচ্ছা কাহিনীর অবতারনা করা হয়.. উমুক নারী এখানে এসে দু‘আ চাওয়াতে স্বামী পেয়েছে.. উমুক নারী সন্তান লাভ করেছে। অনেকে প্রচার করে ‘কেউ ফিরে না খালি হাতে খাজা তোমার দরবার হতে’।

অর্থাৎ যে কোন মাজারে গেলেই প্রয়োজন পূরণ হবে.. উদ্দেশ্য হাসিল হবে..।

জনৈক ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করা হল- তুমি ক্রেতাদের সামনে ওলীর নাম নিয়ে কসম কর অথচ আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে কসম করো না কি ব্যাপার? সে জবাব দিল যতক্ষণ উমুক মাজারের ওলীর নামে আমি কসম না করি ওরা আমার কথা বিশ্বাস করে না।

দেখুন! কিভাবে এরা আল্লাহ্‌র চাইতে মাজারের ওলীকে বেশী সম্মান করে? এবার চিন্তা করে দেখুন কি পার্থক্য থাকতে পারে একটি মাটির ঢিবি.. পাথর বা কাঠ.. মাজার বা দরগাহ.. ছবি বা মূর্তী.. বা যে কোন সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে? কোন পার্থক্য নেই। মোট কথা মানুষ এসবের কাছে যায়। এগুলোর কাছে গোপন কিছু আছে বলে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে এরা উপকার-অপকারের ক্ষমতা রাখে, অভাব দূর করতে পারে, আরোগ্য দিতে পারে..।

ছাহাবী আবূ রাজা আল আত্বারেদী জাহেলিয়াতের যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তার মাঝে এবং এ সমস্ত কবর পূজারীদরে কার্যকলাপে কোন পার্থক্য নেই। তিনি বলেন: “আমরা জাহেলী যুগে মূর্তী পূজা করতাম.. বৃক্ষ ও পাথরের উপাসনা করতাম। আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে, একটি পাথরের ইবাদত করতে করতে যদি তার চাইতে ভাল কোন পাথর দেখতে পেতাম, তবে সেটা ছেড়ে দিয়ে নতুনটার ইবাদত শুরু করতাম। যদি কোন পাথর না পেতাম তবে কিছু মাটি একত্রিত করে ঢিবি বানাতাম। তারপর তার উপর ছাগলের দুধ দহন করতাম- অতঃপর তার তওয়াফ করতাম। একবার সফরে বের হলাম- সাথে ছিল একটি পাথর যার আমরা ইবাদত করতাম। তা রাখতাম চামড়ার থলের মধ্যে। খাদ্য রান্না করার জন্য আমরা যখন আগুন জ্বালাতাম আর চুলা তৈরী করার জন্য তৃতীয় কোন পাথর না পেতাম তখন আমাদের মা‘বূদ পাথরটি সেখানে সেট করতাম আর বিশ্বাস করতাম এটির কারণে আগুন বেশী জ্বলবে।

একবার কোন এক জায়গায় বিশ্রামের জন্য কিছুক্ষণ অবস্থান করলাম। চামড়ার থলে থেকে মা‘বূদ পাথরটিও বের করলাম। বিশ্রাম শেষে সেস্থান থেকে চলে যাওয়ার পর একজন চিৎকার দিয়ে উঠল। তোমাদের রব হারিয়ে গেছে। তাকে খুঁজে বের কর। তখন সবাই মিলে উটের পিঠে চড়ে সর্বস্থানে আমাদের রবকে খুঁজতে শুরু করলাম। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে একজনের চিৎকার শোনা গেল। সে বলছে, তোমাদের রবকে পাওয়া গেছে এবং তার অনুরূপ আর একটি রব (মূর্তী) পাওয়া গেছে। তখন আমি আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে দেখি আমার সাথীরা একটি মূর্তীকে সিজদা করছে। তারপর খুশিতে সেই মূর্তীর সম্মানে আমরা একটি উট যবেহ করলাম।”

ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগে জাহেলদের এ অবস্থা দেখে আশ্চর্য হওয়া ছাড়া আর কিছু নেই। তার চাইতে আশ্চর্যের বিষয় হল নব্য জাহেলিয়াতের মূর্খদের অবস্থা। আপনাকে আল্লাহ্‌র কসম দিয়ে বলছি, পাথর পূজা আর কবর পূজার মধ্যে কি পার্থক্য আছে?  কি পার্থক্য আছে সেই ব্যক্তির মাঝে যে মূর্তীর কাছে নিজ প্রয়োজনের কথা বলে আর যে গলীত মাটি মিশ্রিত হাড্ডির কাছে যায়। যে ওলী-আউলিয়ার কবরের ইবাদত করে আর যে পানি-কাদা দ্বারা তৈরী মূর্তীর ইবাদত করে। কোনই পার্থক্য নেই। কেননা এদের সবারই কথা এক, ‘আমরা এদের ইবাদত এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ্‌র নিকটবর্তী করে দিবে।’ আর এ কথাই কবর পূজারীদেরকে প্রকাশ্য ও সুষ্পষ্ট মূর্তী পূজায় লিপ্ত করেছে।

*****

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s