৭-বন্দী সত্যের সাক্ষ্য দিল

বন্দী সত্যের সাক্ষ্য দিল

হ্যাঁ তারা লাত, মানাত, ওজ্জার উপাসনা করত। কিন্তু তারা মনে করত এগুলো ছোট মা‘বূদ। এরা তাদেরকে মহান মাবূদ আল্লাহ্‌র নৈকট্য দান করবে। তাই তারা বিভিন্ন ধরণের দাসত্ব তাদেরকে উপহার দিত। যাতে করে তারা আল্লাহ্‌র কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করতে পারে। একারণে তারা বলত,

(  مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى)

“আমরা তো তাদের ইবাদত এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ্‌র নৈকট্য দান করবে।” (সূরা যুমার- ৩) তারা আরো বলত, (هَؤُلاَءِ شُفَعاَءُناَ عِنْدَ اللهِ) “এরা আমাদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে সুপারিশকারী।” (সূরা ইউনূস- ১৮) তারা বিশ্বাস রাখত, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ হলেন স্রষ্টা, রিযিক দাতা, জীবন-মরণের মালিক। আল্লাহ্‌ বলেন,

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ، قُلْ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

“আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ্‌। বলুন সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য; কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” (সূরা লোকমান-২৫)

ছহীহ্‌ বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, আবূ হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নজদ অভিমূখে অশ্বারোহী এক দল সৈন্য প্রেরণ করেন। যেন তারা মদীনার চতুর্দিকে কি ঘটছে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তারা যখন ঘোড়ায় চড়ে টহল দিচ্ছিল, এমন সময় দেখতে পেল জনৈক ব্যক্তি তার অস্ত্র একটি গাছে লটকিয়ে রেখে ইহরামের কাপড় পরিধান করছে আর তালবিয়া পাঠ করছে, “লাব্বাইকা, আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লাশারীকা লাকা, ইল্লা শারীকান, হুয়া লাকা, তামলেকুহু ওয়ামা মালাক….” [তোমার দরবারে হাজির, হে আল্লাহ্‌ তোমার দরবারে হাজির, তোমার কোন শরীক নেই। তবে সেই শরীক ব্যতীত যা তোমারই জন্যে, তুমি তার মালিক এবং সে যার মালিক হয়েছে তারও মালিক…।] সে বারবার উক্ত তালবিয়া পাঠ করছে। অশ্বারোহী ছাহাবীগণ তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, মক্কা। তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ছাহাবীগণ বুঝলেন যে, সে নবুওতের মিথ্যা দাবীদার মুসায়লামা কায্‌যাবের এলাকা থেকে এসেছে। তারা তাকে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে এলেন। যাতে করে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার অবস্থা বুঝে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দেখে ছাহাবীদেরকে বললেন, তোমরা জান কাকে তোমরা বন্দী করেছো? এ হচ্ছে ছুমামা বিন ঊচ্ছাল, বনূ হানীফ গোত্রের সরদার। তারপর তিনি নির্দেশ দিলেন, মসজিদের এক খুঁটির সাথে তাকে বেঁধে রাখতে এবং তার যথাযথ সম্মান করতে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় গৃহ থেকে খাদ্য-পানীয় যা ছিল একত্রিত করে তার কাছে পাঠালেন। আর ছুমামার আরোহী সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন তাকে যেন ঘাস-খড় দেয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় যত্ন নেয়া হয়। আর আরোহীটি যেন তার সামনে সকাল-সন্ধায় একবার করে পেশ করা হয়। নির্দেশ মোতাবেক ছাহাবীগণ তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখলেন।

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, কি খবর তোমার ছুমামা!? সে বলল, আমার খবর ভাল হে মুহাম্মাদ! যদি আপনি আমায় হত্যা করেন, তবে আমার কওম সে প্রতিশোধ নিবে। আর যদি অনুগ্রহ করেন তবে আপনার অনুগ্রহ হবে একজন কৃতজ্ঞের প্রতি। আর যদি সম্পদ চান, তবে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে আর কোন প্রশ্ন করলেন না। পরদিন আবার তার কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, ছুমামা কি খবর তোমার? সে বলল, আমার খবর ইতপূর্বে আপনাকে বলেছি যদি আমায় হত্যা  করেন, তবে আমার কওম সে প্রতিশোধ নিবে। আর যদি অনুগ্রহ করেন তবে আপনার অনুগ্রহ হবে একজন কৃতজ্ঞের প্রতি। আর যদি সম্পদ চান, তবে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আর কথা বাড়ালেন না। পরদিন আবার এসে প্রশ্ন করলেন, ছুমামা কি খবর তোমার? সে বলল আমার যা কথা ছিল তা আপনাকে বলেছি।

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন দেখলেন তার মধ্যে ইসলামের প্রতি কোন আগ্রহ নেই; অথচ সে মুসলমানদের ছালাতের দৃশ্য অবলোকন করেছে। তাদের কথাবার্তা শুনেছে। তাদের দয়া-দাক্ষীণ্য প্রত্যক্ষ্য করেছে তখন ছাহাবীদেরকে নির্দেশ দিলেন, ছুমামাকে ছেড়ে দাও। তারা তাকে ছেড়ে দিলেন এবং সাথে অশ্বটিও দিয়ে দিলেন। ছুমামা চলে গেল। তারপর মসজিদে নববীর নিকটবর্তী একটি কুপের কাছে গিয়ে গোসল করল। অত:পর আবার মসজিদে ফিরে এল এবং ঘোষণা দিল “আশহাদু আল্লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ্‌।” আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল।

এরপর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে লক্ষ্য করে বলল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ্‌র শপথ যমীনের বুকে আপনার চেহারার চেয়ে ঘৃণীত কোন চেহারা আমার কাছে ছিল না। এখন এই মুহূর্তে পৃথিবীর মধ্যে আপনার চেহারার চেয়ে প্রিয় আর কোন চেহারা আমার কাছে নেই…।

আল্লাহ্‌র শপথ আপনার ধর্মের চেয়ে ঘৃণীত কোন ধর্ম আমার কাছে ছিল না। এখন এই মুহূর্তে আপনার ধর্মের চেয়ে প্রিয় কোন ধর্ম আমার কাছে দ্বিতীয়টি নেই। আল্লাহ্‌র শপথ আপনার শহরের চেয়ে ঘৃণীত কোন শহর আমার দৃষ্টিতে ছিল না। এখন এই মুহূর্তে আপনার শহরের চেয়ে প্রিয়তম কোন শহর আমার দৃষ্টিতে দ্বিতীয়টি নেই। তারপর ছুমামা বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনার অশ্বারোহী বাহিনী আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে; অথচ আমি ওমরা পালন করার ইচ্ছা করেছিলাম। আপনি আমার ব্যাপারে এখন কি বলেন?

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে কল্যাণের সুসংবাদ প্রদান করলেন এবং নির্দেশ দিলেন সফর পূরা করার এবং মক্কা গিয়ে ওমরা আদায় করার।

ছুমামা মক্কা গেলেন। মুখে তার তাওহীদী তালবিয়া: “…লাব্বাইকা লা শরীকা লাকা লাব্বাইকা… লা শারীকা লাকা..  তোমার দরবারে হাজির হে আল্লাহ্‌ তোমার কোন শরীক নেই.. তোমার কোন শরীক নেই..।

হ্যাঁ ছুমামা মুসলমান হয়েছেন। তিনি আল্লাহ্‌র নির্ভেজাল তাওহীদের ঘোষণা দিচ্ছেন, .. তোমার কোন শরীক নেই..।

সুতরাং আল্লাহ্‌র ইবাদতের সাথে কোন কবরের ইবাদত নয়। কোন মূর্তী নয় যার জন্য ছালাত হবে, সিজদা হবে।

তারপর ছুমামা মক্কা প্রবেশ করলেন। তার আগমণের খবর কুরায়শ নেতৃবৃন্দের কানে পৌঁছে গেল। তারা স্বাগতম জানাতে এগিয়ে এল। কিন্তু একি শুনছে তারা? “…লাব্বাইকা লা শরীকা লাকা লাব্বাইকা… লা শারীকা লাকা..”? একজন প্রশ্ন করল, তুমি কি ধর্ম ত্যাগ করেছো? তিনি বললেন, না; বরং আমি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি।

একথা শুনে তারা ইচ্ছা করল, তাকে কষ্ট দিবে। ব্যাপার খারাপ দেখে তিনি চিৎকার করে উঠলেন: আল্লাহ্‌র শপথ করে বলছি ইয়ামামা থেকে তোমাদের জন্য গমের একটি দানাও আসবে না- যে পর্যন্ত মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে কোন নির্দেশনা না দেন। তারা মূর্তী মা‘বূদদের সম্মান করার চাইতে আল্লাহ্‌ তা‘আলাকে অধিক সম্মান করত। (এজন্য আল্লাহ্র শপথের কথা শুনে তারা দমে গেল)

প্রিয় পাঠক! আপনি আমাকে বলুন আবু জাহেল ও আবু লাহাবের শির্ক ও বর্তমান যুগের লোকদের শির্কের মাঝে কি পার্থক্য? যারা কবরের কাছে পশু যবেহ্‌ করে বা মাজারের দরজায় সিজদা করে বা পশু যবেহ্‌ করে বা তার তওয়াফ করে, বা কোন ওলীর দরবারে গিয়ে বিনীত মস্তকে, ভীত-সন্ত্রস্ত মন নিয়ে দন্ডায়মান হয়। সেখানে গিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিপদে উদ্ধার পাওয়ার আশায় দরখাস্ত করে, রোগ মুক্তি কামনা করে…।

আশ্চর্যের বিষয়! অথচ আল্লাহ্‌ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ

“আল্লাহ্‌কে ছেড়ে তোমরা যাদেরকে ডাক (যাদের ইবাদত কর) তারা তো তোমাদের মতই বান্দা; তাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দিক তো- যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।” (সূরা আ‘রাফ- ১৯৪)

****

এই যে আজকাল কবরে-মাজারে শির্ক হচ্ছে। যেমন সেখানে পশু যবেহ করা, কবরবাসীর কাছে দুআ চাওয়া, তাদের নৈকট্য কামনা করা, তাদের তওয়াফ করা, তাদের কাছে সন্তান.. রোগ মুক্তি ইত্যাদি কামনা করা… এগুলো সবচেয়ে বড় পাপ। হ্যাঁ বরং এ পাপগুলোর ভয়াবহতা ও শাস্তি যেনা-ব্যভিচারের চাইতেও মারাত্মক, মদ্যপান, খুন, পিতামাতার অবাধ্যতার চাইতে কঠিন ও ভয়ংকর। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন,

( إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )

“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমা করেন না যে তার সাথে শির্ক করে। আর তিনি এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা- ৪৮/১১৬)

হ্যাঁ, আল্লাহ্‌ শির্কের পাপ ক্ষমা করবেন না। কিন্তু হতে পারে ইচ্ছা করলে তিনি ব্যভিচারীকে ক্ষমা করতে পারেন। খুনী, অপরাধীকে চাইলে মুক্তি দিতে পারেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “বনী ইসরাঈলের জনৈক ব্যভিচারীনী একদা মরুভুমি দিয়ে চলছিল। দিনটি ছিল কঠিন গরম। ইতমধ্যে সে দেখতে পেল একটি কুকুর কঠিন তৃষ্ণায় হাঁপাচ্ছে। পিপাসায় যেন মারা যাবে। জিহ্বা বের করে সে একটি কুপের কাছে একবার তার উপর উঠছে একবার তার চতুর্দিকে ঘুরছে। ব্যভিচারীনী তার এ পরিস্থিতি দেখে নিজের জুতা খুলে ওড়ানায় বেঁধে কুপ থেকে পানি উঠিয়ে কুকুরকে পান করাল। তার এ কাজের কারণে আল্লাহ্‌ খুশি হয়ে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)

ক্ষমা করে দিলেন আল্লাহ্‌ ব্যভিচারীনীকে? যে কিনা অশ্লীল-অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকত! হারাম উপার্জন থেকে পানাহার করত! কিন্তু কেন? সে কি রাত জেগে ছালাত আদায় করত? সারা দিন নফল ছিয়াম পালন করত? সে কি আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ করেছে? কখনোই না। সে তো একটি পিপাষার্ত কুকুরকে এক ঘোট পানি পান করিয়েছে। আর বিনিময়ে আল্লাহ্‌ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। যদিও সে আল্লাহ্‌র নাফারমানীতে লিপ্ত থাকত; কিন্তু সে আল্লাহ্‌র সাথে কোন ওলীকে শরীক করে নাই। কোন কবরের কাছে শির্ক করে নি। কোন পাথর বা মানুষকে তাযীম করে নি। একারণেই আল্লাহ্‌ তাকে ক্ষমা করেছেন। সুতরাং গুনাহগারদের জন্য ক্ষমা কত নিকটে আর মুশরিকদের জন্য ক্ষমা কত দূরে!

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s