৩-উত্তাল সমুদ্র

উত্তাল সমুদ্র

দুনিয়াটা মুশরেকদের দ্বারা ছিল পরিপূর্ণ। চারদিকে যেন শির্ক ও মূর্তী পূজার জয়জয়কার। কেউ করত মূর্তী পূজা, কেউ কবর পূজা, কেউ মানুষের দাসত্ব করত আবার কেউ গাছের উপাসনা করত।

তাদের রব তা দেখে রাগম্বিত হলেন। কেননা আরব-অনারব সকলের একই অবস্থা। অবশ্য গুটিকতক আহলে কিতাব (ইহুদী-খৃষ্টান) তখনও তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

ঐ সমস্ত মুশরেকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় জনৈক ব্যক্তি। নাম আমর বিন জামূহ।  মানাফ নামে তার একটি মূর্তী ছিল। সে তার সামনে সিজদা করত, তার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করত। মানাফই ছিল বিপদ থেকে তাকে উদ্ধারকারী, প্রয়োজনে আশ্রয় দান কারী। কাঠ দিয়ে বানানো একটি মূর্তী। কিন্তু সেটাই ছিল তার নিকট পরিবার পরিজনের চাইতে বেশী প্রিয়। তার সম্মান ও তাযীমে, সাজগোজে, সুগন্ধি লাগাতে, পোষাক পরাতে অঢেল অর্থ ব্যয় করত। যখন থেকে সে দুনিয়াটা চিনতে শিখেছে এটাই ছিল তার স্বভাব চিত্র। এভাবে সে ষাট বছর বয়সে পদার্পণ করল।

মানুষকে শির্কের শৃংখল থেকে মুক্তি দানের জন্য আল্লাহ্‌ তাআলা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)কে মক্কায় নবী হিসেবে প্রেরণ করলেন। তারপর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুছআব বিন উমাইরকে (রা:) ইসলামের দাঈ এবং শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করলেন মদীনায়। তাঁর দাওয়াতে আমর বিন জামূহের তিন ছেলে তাদের মাতাসহ ইসলাম কবূল করলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে আমর কিছুই জানল না।

একবার ছেলেরা পিতার কাছে গিয়ে ইসলামের দাঈ ও শিক্ষক সম্পর্কে সংবাদ পেশ করলেন এবং তার সামনে কুরআন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করলেন। তারা বললেন, অগণিত মানুষ তো এ লোকটির দা’ওয়াত গ্রহণ করছে, তাঁর অনুসরণ করছে। তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে আপনার মত কি?

সে বলল, আমি তা করতে রাযী নই যে পর্যন্ত মূর্তী  মানাফের কাছে পরামর্শ না করি। তারপর আমর মানাফের কাছে গেল- তারা যখন কোন মূর্তীর সাথে কথা বলত, তখন একজন বুড়ীকে মূর্তীর পিছনে বসিয়ে রাখত। তাদের ধারণানুযায়ী মূর্তী সেই বুড়ীকে যা ইলহাম  করত, বুড়ী সে অনুযায়ী কথা বলত।

আমর খোঁড়াতে খোঁড়াতে মানাফের কাছে গেল- ওর এক পা অপরটি থেকে খাট ছিল- তারপর মূর্তীর প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শনার্থে নিজের ভাল পায়ের উপর ভর করে তার সামনে দন্ডায়মান হল। এরপর মূর্তীর প্রশংসা করল ও গুণগাণ গাইল এবং বলল, হে মানাফ! সন্দেহ নেই মদীনায় নতুন আগমণকারী সম্পর্কে তুমি অবগত আছ। সে তুমি ছাড়া কারো সাথে খারাপ আচরণ করে না। তোমার উপাসনা করতে সে আমাদেরকে নিষেধ করে। আমি এখন কি করব হে মানাফ? মূর্তী কোন জবাব দিল না। আমর আগের কথাগুলো পূণরাবৃত্তি করল। কিন্তু কোন জবাব পেল না। তখন আমর বলল, সম্ভবত: তুমি আমার উপর রাগম্বিত হয়েছো। ঠিক আছে আমি তোমাকে বেশী বিরক্ত করব না, যখন তোমার ক্রোধ থেমে যাবে, আবর আসব। একথা বলে সে বেরিয়ে গেল।

রাতের আঁধার নেমে এল। আমরের ছেলেরা মানাফের কাছে এসে তাকে নিয়ে একটি গর্তের মধ্যে ফেলে দিল। গর্তটিতে সাধারণতঃ মৃত প্রাণী ও ময়লা-আবর্জনা ফেলা হত। সকালে আমর মূর্তীর ঘরে গেল। উদ্দেশ্য তাকে সালাম করা। কিন্তু একি? মানাফ কোথায়? আমার মাবূদ? চিৎকার করে বলল, তোমরা ধ্বংস হও! গতরাতে কে আমার মাবূদের সাথে শত্রুতা করেছো? পরিবারের কেউ কোন কথা বলল না। সে ভীত হয়ে গেল, চিন্তিত ও দুঃখিত হয়ে মূর্তীর অনুসন্ধানে বের হল। অনেক খোঁজা-খুঁজির পর শেষে দেখতে পেল মূর্তী একটি গর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সেখান থেকে তাকে বের করে নিয়ে এল এবং পরিস্কার করে আগের স্থানে সুন্দর করে রেখে দিল। মূর্তীকে লক্ষ্য করে বলল, মানাফ তুমি যদি বলতে কে তোমার সাথে এ দূর্ব্যবহার করেছে, তবে তাকে আমি লাঞ্ছিত করতাম।

রাত এল। ছেলেরা আবার মূর্তীটিকে নিয়ে সেই দূর্গন্ধময় গর্তে নিক্ষেপ করল। সকালে বৃদ্ধ আমর মূর্তীর খোঁজে গিয়ে তাকে নির্দিষ্ট স্থানে পেল না। ক্রোধে চিৎকার করে উঠল এবং নানাভাবে পরিবারের লোকদেরকে ধমকাল এবং শাস্তির অঙ্গীকার করল। তারপর মূর্তীকে উক্ত গর্ত থেকে নিয়ে এসে গোসল করিয়ে সুগন্ধি লাগিয়ে যথাস্থানে সম্মানের সাথে রেখে দিল।

প্রতি রাতেই ছেলেরা মূর্তীর সাথে এরূপ আচরণ করতে থাকে আর সকালে আমর তাকে কুড়িয়ে নিয়ে এসে যতœ করে। এক পর্যায়ে যখন সে খুব সংকীর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে গেল তখন একদিন মূর্তীকে লক্ষ্য করে বলল, তোমার ধ্বংস হোক হে মানাফ! একটি ছাগলও তো নিজ নিতম্বের হেফাযত করতে পারে! তারপর মূর্তীর মাথার কাছে একটি তলোয়ার ঝুলিয়ে রেখে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, এ তলোয়ার দ্বারা শত্রুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবে…।

আবার রাতের আঁধার ঘনিয়ে এল। ছেলেরা মূর্তীটিকে একটি মৃত কুকুরের দেহের সাথে বেঁধে দুর্গন্ধময় একটি কুপের মধ্যে নিক্ষেপ করল। সকালে আমর মানাফের খোঁজে বের হয়ে যখন দেখল কুপের মধ্যে তার এই অবস্থা, তখন দুঃখ করে বলল,

ورب يبول الثعلبان برأسه          لقد خاب من بالت عليه الثعالب

মন রব যার মাথায় খেঁক শিয়াল পেশাব করে!

নিশ্চয় এধরণের রব অকৃতকার্য যার উপর খেঁকশিয়াল পেশাব করে।’

অতঃপর আমর বিন জামূহ্‌ ইসলাম গ্রহণ করলেন। দ্বীনের ময়দানে নেককারদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন। দেখুন তাঁর অবস্থা- ঈমানী জযবা। যখন মুসলিমগণ বদরের যুদ্ধে বের হলেন, তখন ছেলেরা তাকে বাঁধা দিল। কারণ তিনি বৃদ্ধ। তাঁর পা খোঁড়া। কিন্তু তিনি আল্লাহ্‌র পথে জিহাদে যেতে জিদ ধরলেন। ছেলেরা বাধ্য হয়ে রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)এর কাছে গিয়ে বললেন। তিনি তাকে মদীনাতেই থেকে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। বাধ্য হয়ে তিনিও নির্দেশ শিরধার্য করলেন।

এল ওহুদ যুদ্ধ। আমর (রা:) জিহাদের জন্য বরে হতে চাইলেন। ছেলেরা বাধা দিতে চাইল। তখন তিনি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)এর কাছে গিয়ে নিজের দৃঢ় ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করলেন। বললেন, ছেলেরা আপনার সাথে জিহাদে যেতে আমাকে নিষেধ করছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ্‌ তো আপনাকে (বৃদ্ধ ও খোঁড়া হওয়ার কারণে) যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আল্লাহ্‌র শপথ! আশা করছি আমি আমার এই খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে বিচরণ করব। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে জিহাদে বের হওয়ার অনুমতি দিলেন। তিনি স্বীয় অস্ত্র ধারণ করলেন এবং দুআ করলেন, (اللهُمَّ ارْزُقْنِيْ الشَّهاَدَةَ ولاَتَرُدَّنِيْ إلىَ أهْلِيْ) হে আল্লাহ্‌! আমাকে শাহাদাতের সুধা পান করাও। পরিবারের কাছে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো না।

যখন সৈন্য বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করল। দুদল একত্রিত হল। যুদ্ধ ভীষণ আকার ধারণ করল। অস্ত্রের ঝনঝনানীতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। আমর (রা:) স্বীয় তরবারী নিয়ে শত্রু সৈন্যের উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। মূর্তী পূজারীদের সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত জনৈক কাফের তার দিকে অগ্রসর হয়ে তরবারীর আঘাতে তাঁকে শহীদ করে দিল। আমর (রা:)কে দাফন করা হল। তিনি শামিল হলেন সেই সব ব্যক্তিদের কাতারে যাদের উপর আল্লাহ্‌ বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন।

৪৬ বছর পর। মুআবিয়া (রা:)এর শাসনামল। ওহুদের শহীদদের কবরস্থানে প্রচন্ড বন্যা দেখা দিল। সমস্ত কবর প্লাবিত হয়ে গেল। মুসলমানগণ শহীদদের লাশ স্থানান্তর করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। যখন আমর বিন জামূহের (রা:) কবর খনন করা হল দেখা গেল, তিনি যেন ঘুমন্ত.. তাঁর শরীর নরম.. পার্শদেশ একটু বাঁকা হয়ে আছে। মাটি তার শরীরের কোন কিছুই নষ্ট করে নি।

চিন্তুা করুন! আল্লাহ্‌ কিভাবে তার শেষ আঞ্জাম (পরিণতি) সুন্দর করেছেন- যখন তিনি সত্য গ্রহণ করেছেন। বরং দেখুন আখেরাতের আগেই কিভাবে আল্লাহ্‌ তার কারামতের প্রকাশ ঘটিয়েছেন- যখন কিনা তিনি কালেমা লাইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ কে বাস্তবায়ন করেছেন। এটা তো সেই কালেমা যার জন্য আসমান-যমীন সৃষ্টি হয়েছে। সমস্ত জগত আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন। একালেমাই হল জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। এর জন্যই সৃষ্টি হয়েছে জান্নাত ও জাহান্নাম। বিভক্ত হয়েছে মানব জাতি দু’ভাগে মুমিন ও কাফের, বা নেককার ও বদকার।

বান্দার দুপা আল্লাহ্‌র সম্মুখে দন্ডায়মান হয়ে থাকবে, যে পর্যন্ত সে দু’টি প্রশ্নের উত্তর না দিবে। তোমরা কার ইবাদত করতে? তোমরা রাসূলদের (বা তার প্রতিনিধিদের) আহ্বানের কি জবাব দিয়েছ?

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s