১-পূর্বকথা

১-পূর্বকথা

الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه ومن والاه، أما بعد:

যাবতীয় প্রশংসা এক আল্লাহ্‌র জন্য। যাঁর কোন শরীক নেই। সমকক্ষ নেই। নেই কোন সহযোগী। যিনি শুধুমাত্র তাঁর একত্ববাদ তথা তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য জিন ও মানুষ্য জাতি সৃষ্টি করেছেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাওহীদের শ্রেষ্ঠ প্রচারক ও শিক্ষক মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি যিনি তাওহীদের মর্মবাণী প্রচারের জন্য জীবনের সবচেয়ে বেশী সময় অতিবাহিত করেছেন।

তাওহীদ মানুষের উপর সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে বড় ফরয। ইহ-পরকালিন মুক্তি তাওহীদের বাস্তবায়নের মাঝেই সীমাবদ্ধ। তাওহীদের জ্ঞান না থাকলে কোন জ্ঞানই পরিপূর্ণ নয়। তাওহীদ বিহীন কোন আমলও গ্রহণীয় নয়। আল্লাহ্‌ বলেন, (وَقَدِمْناَ إلَى ماَ عَمِلُواْ مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْناَهُ هَباَءً مَنْثُوْراً) “আর আমি তাদের আমলের দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর তা (তাওহীদ শুণ্য হওয়ার কারণে) বিক্ষিপ্ত ধুলিকণার ন্যায় উড়িয়ে দিব। ” (সূরা ফুরক্বান- ২৩)

তাওহীদই হল পারস্পরিক যোগসূত্রের সেতু বন্ধন রচনাকারী। তাওহীদ না থাকলে সকল সম্পর্ক মূল্যহীন। মানুষের ইতিহাসে ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্রের মাঝে বিচ্ছন্নতা ঘটেছে সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে শুধুমাত্র এই তাওহীদকে কেন্দ্র করে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম তাওহীদ বিরোধী কর্মকান্ড তথা শির্কের সূচনা ঘটে নূহ (আ:) এর সমপ্রদায়ের মধ্যে। তিনি যখন জাতিকে তাওহীদের প্রতি আহবান জানালেন, শির্ক থেকে সতর্ক করলেন। তখন তারা বিষয়টিকে হাসি-ঠাট্টার সাথে উড়িয়ে দিল। তাঁর কথার কোনই মূল্যায়ন করল না। আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি নাখোশ হলেন। প্রেরণ করলেন কঠিন আযাব- মহা প্লাবন। নূহ (আ:)কে আদেশ করলেন একটি কিশতী (নৌকা) তৈরী করার। নৌকা প্রস্তুত হয়ে গেলে তিনি লোকদের তাওহীদের এই কিশতীতে আরহোণ করার আহ্বান জানালেন। বললেন, যে ব্যক্তি এই নৌকায় আরোহন করবে, সেই আল্লাহ্‌র আযাব থেকে পরিত্রান পেয়ে যাবে। তিনি বললেন: (ارْكَبُوْا فِيْهاَ بِسْمِ اللهِ مَجْرِيهاَ وَمُرْساَهاَ، إنَّ رَبِّيْ لَغَفُوْرٌ رَحِيْمٌ ) “ তোমরা এতে আরোহণ কর। আল্লাহ্‌র নামেই এর গতি ও স্থিতি। আমার পালনকর্তা অতিব ক্ষমাপরায়ণ, মেহেরবান।” নৌকা এত বিশাল ছিল যে, পাহাড়সম তরঙ্গমালার মধ্যেও তা নির্বিঘ্নে চলতে পারত। নূহ (আ:)এর এক ছেলের নাম ছিল ‘কেনআন’।
সে তখনও নৌকায় আরোহণ করেনি। নূহ (আ:) প্লাবনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে পিতৃসুলভ স্নেহ বশতঃ ছেলেকে ডেকে বললেন, (ياَ بُنَيَّ ارْكَبْ مَعَناَ ولاَ تَكُنْ مَّعَ الكاَفِرِيْنَ) “ হে প্রিয় বৎস! আমাদের সাথে নৌকায় আরোহণ কর; কাফেরদের সাথে থেকো না।” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছেলে ছিল কাফের। আল্লাহ্‌র অসীম ক্ষমতাকে সে অস্বীকার করল। জবাব দিল, (سَآوِيْ إلىَ جَبَلٍ يَعْصِمُنِيْ مِنَ الْماَءِ) “আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে।” কিন্তু পিতা সন্তানকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন। বললেন, (لاَ عاَصِمَ مِنْ أمْرِ اللهِ إلاَّ مَنْ رَحِمَ) “আজকে (কোন উঁচু পর্বত বা প্রাসাদ) কাউকে আল্লাহ্‌র আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহ্‌র বিশেষ রহমত ছাড়া বাঁচার কোন উপায় নেই।” এভাবে দূর থেকে পিতা-পুত্রের কথোপাকথন চলছিল। (وَحاَلَ بَيْنَهُماَ الْمَوْجُ فَكاَنَ مِنَ الْمُغْرِقِيْنَ) “এই সময় সহসা এক উত্তাল তরঙ্গ এসে উভয়ের মাঝে অন্তরালের সৃষ্টি করল। ফলে সে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল।” (সূরা হূদ- ৪১-৪৩) কি আশ্চর্য! পিতা আল্লাহ্‌র নবী হয়েও স্বীয় পুত্রকে রক্ষা করতে পারলেন না। কারণ পুত্র তাওহীদের কিশতী- মুক্তির নৌকায় আরোহণ করতে অস্বীকার করেছিল।

বর্তমানে মুসলিম জাতি তাওহীদের বড় দাবীদার। ‘আমরা তাওহীদী জনতা। কিন্তু মুসলমানদের আমল-ইবাদতের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়- তার অধিকাংশই তাওহীদ শুন্য। তাওহীদ সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা অধিকাংশ আলেমেরই নেই। আর তাই তাওহীদ বিরোধী তথা শির্কী কথা ও কর্মকান্ড সমাজে ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হয়। অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, আলেম সমাজের একটি বিরাট অংশ প্রত্যক্ষ্যভাবে উক্ত শির্কের চর্চা করে থাকে। মসজিদে বসেই তারা শির্কী কর্মকান্ড পরিচালনা করে। তাবীজ লিখা, গণনা করে ভবিষ্যত সম্পর্কে মত প্রকাশ করা, বায়আত করার নামে শির্কী অসীলার প্রতি মানুষকে আহবান জানানো…।

পীর-মুশির্দদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামে তাদেরকে আল্লাহ্‌র চাইতে অধিক ভালবাসা এবং তাদের কাছে বিপদাপদে সাহায্য-সহযোগিতা প্রার্থনা করা..।
তাদের উদ্দেশ্যে নযর-মান্নত করা.. ইত্যাদি।

এর চাইতে দুঃখ জনক বিষয় হল- আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই তাওহীদের শিক্ষা থেকে বঞ্ছিত। (দু একটি ছাড়া) এমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না; যেখানে তাওহীদ বা আক্বীদাহ্‌ নামে কোন পুস্তক সিলেবাসভুক্ত রয়েছে। বরং এমন অনেক মাদ্রাসা পাবেন, যা বিভিন্ন মাজার-কবর সংলগ্ন। অথচ উক্ত মাজার সমূহে সার্বক্ষণিক অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাওহীদ বিরোধী শির্কের মহড়া। অবাধে পদদলিত হচ্ছে আল্লাহ্‌র অধিকার।

বক্ষমান পুস্তকটিতে লিখক অত্যন্ত সুন্দর ভঙ্গিতে তাওহীদের বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছেন। যা থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় তাওহীদের প্রকৃতরূপ কি এবং বর্তমান মুসলমানদের বাস্তব পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে? বইটি আরবী ভাষায় পড়ে বাংলাভাষী ভাইদের জন্য তা উপস্থাপন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই। যার ফলে আজ তা কিতাব আকারে আপনাদের সামনে উপস্থিত।

এ পুস্তক থেকে তাওহীদ প্রিয় পাঠক-পাঠিকা যদি তাদের পিপাসা নিবারণের সামান্যতম সুযোগ লাভ করেন তবে আমাদের শ্রম সার্থক হবে। একিতাবের লিখক, অনুবাদক এবং যারা তা প্রকাশ ও মুদ্রণের কাজে সহযোগিতা করেছেন আল্লাহ্‌ তাদের সবাইকে সর্বোত্তম পারিতোষিক দান করুন। এবং জীবনের শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত সবাইকে তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দিন। আমীন॥

আরয গুযার,

মুহা: আবদুল্লাহ্ আল কাফী

  লিসান্স মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

জুবাইল দা‘ওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সঊদী আরব

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s